নয় কোটির ইনজেকশনের অপেক্ষায় তিন বছরের অর্কজিত! চোখের জলে দিন গুনছে বালুরঘাটের কাঠমিস্ত্রীর পরিবার, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সাহায্যের আকুতি
বালুরঘাট, ২২ জুন —- মাত্র আড়াই বছরের শিশুর মুখে এখনও ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি ভাষা। খেলনা হাতে ছুটে বেড়ানোর বয়সেই তার শরীরকে গ্রাস করেছে এক দুরারোগ্য ব্যাধি। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এখন একমাত্র ভরসা নয় কোটি টাকার একটি ইনজেকশন। সেই অর্থ জোগাড় করা তো দূরের কথা, প্রতিদিনের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন বাবা। তাই শেষ আশ্রয় হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের করুণ আর্জি জানিয়েছে পরিবার।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট ব্লকের হাতিয়াপাড়ার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ মণ্ডলের একমাত্র সন্তান অর্কজিত মণ্ডল আজ মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফি (এসএমএ) টাইপ-টু নামের এক বিরল ও ভয়ঙ্কর রোগ ধীরে ধীরে গ্রাস করছে তার শরীর। প্রতিদিন একটু একটু করে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে তার পেশি, কমে যাচ্ছে চলাফেরার শক্তি। অথচ শিশুটি এখনও বুঝতে শেখেনি জীবনের এত বড় নিষ্ঠুরতা।
কয়েক মাস আগেও পরিবারের মনে ছিল আশার আলো। হয়তো একটু চিকিৎসা হলেই ছেলে সুস্থ হয়ে উঠবে। সেই আশাতেই মালদা, শিলিগুড়ি থেকে বেঙ্গালুরু— একের পর এক হাসপাতালের দরজায় কড়া নাড়েন বাবা-মা। কিন্তু চিকিৎসকদের মুখে রোগের নাম আর চিকিৎসার খরচ শুনে যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে গোটা পরিবার। শিশুটিকে বাঁচাতে প্রয়োজন একটি বিশেষ ইনজেকশন, যার মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা।
সংখ্যাটা শুনতে যতটা বড়, একজন দরিদ্র কাঠমিস্ত্রীর কাছে তা তার থেকেও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। প্রতিদিন কাঠ কেটে, ঘাম ঝরিয়ে যে মানুষটি সংসারের ভাত জোগাড় করেন, তাঁর কাছে ৯ কোটি টাকা মানে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নও নয়— এক অদৃশ্য পাহাড়। তবুও বাবা বিশ্বজিৎ হার মানতে চান না। কারণ পাহাড়ের ওপারে রয়েছে তাঁর সন্তানের জীবন।
অর্কজিতের মা পায়েল মণ্ডলের চোখের জল যেন থামতেই চায় না। তিনি বলেন প্রথমে ছেলের হাঁটাচলায় সমস্যা দেখা দেয়। বয়স বাড়লেও অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিল না সে। মালদা ও শিলিগুড়ির একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বেঙ্গালুরুতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই সামনে আসে ভয়াবহ সত্য। চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি এসএমএ টাইপ-টু রোগে আক্রান্ত। সেই মুহূর্ত থেকেই কার্যত ভেঙে পড়েছে পরিবার।
কণ্ঠরোধ হয়ে আসে বাবা বিশ্বজিৎ মণ্ডলের। তিনি বলেন, আমি একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রী। কোনওভাবেই নয় কোটি টাকার চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন জায়গায় সাহায্যের আবেদন করেছি। এখন মুখ্যমন্ত্রী ও সরকারের হস্তক্ষেপই শেষ ভরসা। সবাই একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো আমার ছেলেটা বাঁচবে।
আর এক কোণে বসে নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদতে থাকেন ঠাকুরমা কাকলি মণ্ডল। তাঁর কাঁপা গলায় একটাই প্রার্থনা, মানুষের কাছে হাত জোড় করে বলছি, আমার নাতিটাকে বাঁচিয়ে দিন। ওর তো এখনও পৃথিবী দেখাই হয়নি।
একটি ছোট্ট শিশুর জীবন আজ আটকে আছে একটি ইনজেকশনের দামে। একদিকে অর্থের অঙ্ক, অন্যদিকে একটি নিষ্পাপ প্রাণ। আর সেই অসম লড়াইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক পরিবার আজ সমাজ, প্রশাসন এবং সরকারের কাছে কাতর আবেদন জানাচ্ছে— ‘আমাদের সন্তানের বাঁচার অধিকারটুকু ফিরিয়ে দিন। নয় কোটির অঙ্কের কাছে হারিয়ে যেতে দেবেন না ছোট্ট অর্কজিতের হাসি।’

























