ঝড়ে উপড়ে পড়া বটগাছের নিচেই চার মাস ধরে চাপা উন্নয়ন! প্রশাসনিক উদাসীনতার অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছে বোল্লার হরিহরপুর গ্রাম
বালুরঘাট, ১৬ জুলাই —- উন্নয়নের ঢাক যতই বাজুক, দক্ষিণ দিনাজপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাস্তব ছবি যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাস্তার মাঝখানে ঝড়ে উপড়ে পড়া একটি বিশাল বটগাছ চার মাস ধরে একইভাবে পড়ে রয়েছে। গাছটি সরানোর কেউ নেই, রাস্তা সংস্কারেরও কোনও উদ্যোগ নেই। ফলে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একাধিক গ্রাম। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাদা, খানাখন্দ আর ভাঙাচোরা বিকল্প রাস্তা পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। স্কুলপড়ুয়া থেকে রোগী, কৃষক থেকে শ্রমিক কারোরই দুর্ভোগের শেষ নেই। অভিযোগ, বারবার প্রশাসনের দরজায় কড়া নাড়লেও মেলেনি কোনও সমাধান। আর যার জেরেই ক্ষোভে ফুঁসছেন গ্রামবাসীরা। এবার আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট ব্লকের বোল্লা গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিহরপুর গ্রামে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু এই সমস্যার আঁচ শুধু হরিহরপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। পতিরাম বিএসএফ গেট সংলগ্ন এলাকা থেকে খাসপুর পর্যন্ত এই একমাত্র রাস্তাটিই রায়পুর, পালপাড়া-সহ একাধিক গ্রামের হাজার হাজার মানুষের নিত্যদিনের ভরসা। দীর্ঘদিন ধরেই রাস্তাটি ছিল বেহাল। তার উপর প্রায় চার মাস আগে প্রবল ঝড়ে গ্রামের মাঝখানে উপড়ে পড়ে একটি বিশাল বটগাছ। সেই মুহূর্ত থেকেই কার্যত থমকে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা।
আজও সেই গাছ রাস্তার উপরই পড়ে রয়েছে। না কাটা হয়েছে, না সরানো হয়েছে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস কেটে গেলেও প্রশাসনের কোনও তৎপরতা চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষকে ব্যবহার করতে হচ্ছে একটি বিকল্প কাঁচা রাস্তা, যা বর্ষার জলে এখন আরও বিপজ্জনক। খানাখন্দে ভরা সেই পথে টোটো চলাচল প্রায় অসম্ভব। সামান্য ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা গ্রামবাসীদের।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। বাহিচা স্কুলে পৌঁছতে বহু পড়ুয়াকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হচ্ছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছনোও হয়ে উঠছে দুঃস্বপ্ন। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যেতেও নিত্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
গ্রামের বাসিন্দা শব মুর্মু, রাজু মুর্মু, সুমি পাহান ও মামনি মুর্মুর কথায়, চার মাস ধরে একটা গাছ রাস্তার উপর পড়ে আছে। পঞ্চায়েত, বিডিও, এসডিও— সবাইকে জানিয়েছি। শুধু আশ্বাস মিলেছে, কাজ কিছুই হয়নি। আমাদের জীবনযাত্রা থমকে গিয়েছে। আর কতদিন এভাবে চলবে?
দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী বৃষ্টি রায়ের আক্ষেপ, রাস্তার জন্য টোটো আসে না। অনেকদিন হেঁটেই স্কুলে যেতে হয়। বর্ষায় পিছলে পড়ে চোটও লেগেছে। আমাদের ভবিষ্যতের কথা কেউ ভাবছে না।
পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন হরিহরপুরের পঞ্চায়েত সদস্য পুষ্প ওরাওও। তাঁর দাবি, গাছ সরানো এবং রাস্তা সংস্কারের বিষয়টি তিনি একাধিকবার পঞ্চায়েত প্রধানকে জানিয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। গ্রামবাসীদের ক্ষোভ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই তিনি মনে করেন।
একটি উপড়ে পড়া গাছ আজ শুধু রাস্তা আটকে রাখেনি, আটকে দিয়েছে কয়েক হাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবনও। চার মাস ধরে প্রশাসনের উদাসীনতার ভার বইতে বইতে ক্লান্ত হরিহরপুরের মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন তুলছেন— একটি গাছ সরাতে যদি চার মাস লেগে যায়, তবে উন্নয়নের দাবি কি শুধুই কাগজে-কলমে? এখন দেখার, ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারির পর প্রশাসনের ঘুম ভাঙে, নাকি আরও দীর্ঘ হয় অপেক্ষার প্রহর।























