কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের নির্দেশিকা মেনে ডুবে মৃত্যু রোধে নজির গড়ছে বাংলা

0
33

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের নির্দেশিকা মেনে ডুবে মৃত্যু রোধে নজির গড়ছে বাংলা, মডেল দেখতে লন্ডন থেকে দক্ষিণ দিনাজপুরে আরএনএলএই প্রতিনিধি দল
শীতল চক্রবর্তী গঙ্গারামপুর | ৩১মে দক্ষিণ দিনাজপুর।
জল জীবন দেয়, আবার কেড়েও নেয়। অথচ সামান্য সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উদ্যোগেই রোধ করা সম্ভব বহু অকাল মৃত্যু। সেই লক্ষ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে যে অভিনব উদ্যোগ চলছে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত। সেই কাজ সরেজমিনে দেখতে এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে সুদূর লন্ডন থেকে দক্ষিণ দিনাজপুরে এলেন রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন (আরএনএলএই)-এর প্রতিনিধি দল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউ এইচও)-র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ জলে ডুবে প্রাণ হারান।ডুবে মৃত্যু বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় অথচ দীর্ঘদিন অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।ভারতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ যায় এই প্রতিরোধযোগ্য কারণে।ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গও অন্যতম।
এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের অনিচ্ছাকৃত আঘাত ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জাতীয় কৌশল”এবং ডব্লিউ এইচ ও-র সুপারিশকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউট (সিনি)। শিশুদের জন্য নিরাপদ তত্ত্বাবধান কেন্দ্র ‘কবচ’, সাঁতার শিক্ষা, সিপিআর প্রশিক্ষণ,কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলার মতো একাধিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাস্তবায়িত হচ্ছে এই উদ্যোগ।
এই কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে দক্ষিণ দিনাজপুরে আসেন আর এনএলএই এর প্রতিনিধি মি. জেমস পল ইয়ং এবং মিস ফিবি মে চিপচেজ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সিনি-র লিড ইনজুরি প্রিভেনশন ও ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি অফিসার সুজয় রায়, সহকারী প্রজেক্ট ম্যানেজার সায়নী অধিকারী-সহ প্রকল্পের অন্যান্য সদস্যরা।
গঙ্গারামপুরে জেলাস্তরের অগ্রণী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নারী মুক্তি মহিলা সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকল্পের অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপস্থিত ছিলেন গঙ্গারামপুরের বিধায়ক সত্যেন্দ্র নাথ রায়, গঙ্গারামপুর পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর অশোক বর্ধন, ডিস্ট্রিক্ট প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর বিধান চক্রবর্তী, পি.এইচ.এন. দুলালী সাহা, বিশিষ্ট সমাজসেবী কাঞ্চন বসাক, প্রণব বসাক, সুদীপ্ত মুখার্জী সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অংশগ্রহণমূলক ভিডিও নির্মাণ কর্মসূচি।পাঁচ দিনব্যাপী এই বিশেষ উদ্যোগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি সদস্যরাই ক্যামেরার সামনে তুলে ধরবেন তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা।ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ, সিপিআর প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্য, পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের গল্প নথিভুক্ত করা হবে ভিডিওর মাধ্যমে। উদ্দেশ্য একটাই— উন্নয়নের গল্প যেন বাইরের কেউ নয়, কমিউনিটির মানুষ নিজেরাই বলেন।
প্রতিনিধি দল সিপিআর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলা ও কমিউনিটি সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তাঁরা জানতে চান, প্রশিক্ষণের আগে ডুবে যাওয়া বা হৃদরোগজনিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষের ধারণা কী ছিল এবং প্রশিক্ষণের পরে তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও প্রস্তুতিতে কী পরিবর্তন এসেছে।
সিনি-র পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুজয় রায় বলেন, “ডুবে মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দীর্ঘদিন এই বিষয়টি নীতিনির্ধারণের আলোচনার বাইরে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা, কমিউনিটি প্রশিক্ষণ এবং জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। গ্রামের মানুষ নিজেরাই বলছেন, কীভাবে সিপিআর প্রশিক্ষণ তাঁদের জীবন বাঁচানোর সক্ষমতা দিয়েছে।” নারীমুক্তি মহিলা সমিতির সম্পাদক কাঞ্চন বসাক বলেন,”এমন কাজ আমরা মানুষদের জন্য করে যাব।”
বিধায়ক সত্যেন্দ্র নাথ রায় এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে আরও বৃহত্তর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। বিষয়টি রাজ্য স্তরে উত্থাপন করা হবে।” পাশাপাশি তিনি পশ্চিমবঙ্গে সিনি-র কাজের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনও চেয়ে পাঠান।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় চাইল্ড পার্লামেন্টের শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও উপস্থিত সকলের মন জয় করে। আর এনএলএই এর প্রতিনিধি ফিবি মে চিপচেজ বলেন, “যখন কমিউনিটির মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা নিজেরাই তুলে ধরেন, তখন সেই গল্পই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পি ভি এমএসসি সেই সুযোগটাই তৈরি করছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, সিপিআর প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ একসঙ্গে এগিয়ে এলে বহু অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। আর সেই লক্ষ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে সিনি।
একসময় যে সমস্যা নিয়ে খুব কম আলোচনা হত, আজ সেই ডুবে মৃত্যুর মতো জনস্বাস্থ্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের আগমনই প্রমাণ করছে— সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে জীবন রক্ষার লড়াইয়ে সাফল্য আসবেই। কারণ, জল যেমন জীবন দেয়, তেমনই সচেতনতার অভাবে কেড়েও নিতে পারে প্রাণ। তাই এখনই দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা এবং জীবন বাঁচানোর দক্ষতা ছড়িয়ে দেওয়া।