১৬০ বছরের প্রাচীন বিদ্যেশ্বরী মুখোশ কালী পুজোয় ভক্তদের ঢল, জমে উঠল ঐতিহ্যবাহী মেলা
শীতল চক্রবর্তী, বালুরঘাট, ১৮ মে, দক্ষিণ দিনাজপুর :
থরে থরে সাজানো কলার ছড়ি।কলাপাতার উপর সাজিয়ে রাখা বাতাসা,লাড্ডু ও বিভিন্ন ভোগ সামগ্রী। জৈষ্ঠ্যের প্রথম সোমবারকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর ব্লকের বিদ্যেশ্বরী গ্রামে যেন ভক্তি আর উৎসবের মিলনমেলা। প্রায় ১৬০বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বিদ্যেশ্বরী মুখোশ কালী পুজোকে ঘিরে সোমবার সকাল থেকেই হাজার হাজার ভক্তের ঢল নামে মন্দির চত্বরে। সেই সঙ্গে জমে ওঠে গ্রামীণ মেলা।
গঙ্গারামপুর চৌপথি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে হামজাপুর রুটের বিদ্যেশ্বরী গ্রাম। বহু বছর আগে এই এলাকা ছিল বনজঙ্গলে ঘেরা নির্জন জনপদ। স্থানীয়দের কথায়, সেই সময় পুনর্ভবা নদীতে সারা বছর জল থাকত এবং প্রবল স্রোত বইত। বৈশাখ মাসের শেষ দিকে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা নদীতে স্নান করতে গিয়ে দেখতে পান বাংলাদেশের দিক থেকে কাঠের একটি বস্তু ভেসে আসছে। পরে উপেন মণ্ডল ও বজ্র মণ্ডল সেই কাঠের বস্তুটি উদ্ধার করে দেখতে পান সেটি আসলে কালীমাতার একটি কাঠের মুখোশ।
এরপর সেই মুখোশ গ্রামে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয়দের দাবি, সেদিন রাতেই বজ্র মণ্ডল স্বপ্নাদেশ পান— ওই মুখোশকে কালীমাতা রূপে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে হবে। পরদিন তিনি বিষয়টি গ্রামবাসীদের জানালে সকলে সম্মত হন। তারপর থেকেই শুরু হয় কাঠের মুখোশ রূপী মা বিদ্যেশ্বরীর আরাধনা।
প্রথমদিকে জঙ্গলের মধ্যে একটি কাঁচা মন্দিরে পুজো শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এলাকায় জনবসতি বাড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং ধীরে ধীরে মা বিদ্যেশ্বরীর মাহাত্ম্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ১৬০ বছর আগে জৈষ্ঠ্যের প্রথম সোমবারেই প্রথম পুজো হয়েছিল। সেই প্রাচীন রীতি আজও মেনে প্রতিবছর জৈষ্ঠ্য মাসের প্রথম সোমবারে অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক পুজো।
সোমবার সকাল থেকেই বিদ্যেশ্বরী, হামজাপুর, চাম্পাতলি, সর্বমঙ্গলা, কাটাবাড়ি, বাওলা, দেবীপুর, টুলিয়াপাড়া, মাহুরকিসমত শিববাড়ি, গঙ্গারামপুর সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ভক্ত মন্দিরে ভিড় জমান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুজো দিতে আসা মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। বহু ভক্ত মানত পূরণে পায়রা, কলার ছড়ি, কাঠাল সহ নানা সামগ্রী নিবেদন করেন। প্রাচীন এই পুজোয় পাঠাবলিরও প্রচলন রয়েছে।
পুজোকে ঘিরে মন্দির চত্বরে বসেছে জমজমাট মেলা। খেলনা, মিষ্টি, গৃহস্থালির সামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোকানে উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য চিত্র ধরা পড়ে বিদ্যেশ্বরীতে।
গঙ্গারামপুরের এক ভক্ত ডিউটি তথ্য বিউটি দত্ত বলেন,“মায়ের টানে প্রতি বছর এখানে ছুটে আসি। মায়ের কাছে মানত করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় বলে আমাদের বিশ্বাস।”
পুজো কমিটির এক উদ্যোক্তা বলেন,“এটি শুধু একটি পুজো নয়, আমাদের এলাকার বহু বছরের ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মা বিদ্যেশ্বরীর আরাধনা। প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন। সকলের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবেই পুজো ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে।”
Home উত্তর বাংলা দক্ষিণ দিনাজপুর ১৬০ বছরের প্রাচীন বিদ্যেশ্বরী মুখোশ কালী পুজোয় ভক্তদের ঢল, জমে উঠল ঐতিহ্যবাহী...
























