দেবী দুর্গার মতোই নাম তাঁর বাসন্তী, তবে হাতে ত্রিশূল নয় সূচ-সুতো-৯০ ছুঁইছুঁই বয়সেও সৃষ্টির সাধনায় মগ্ন

0
20

*দেবী দুর্গার মতোই নাম তাঁর বাসন্তী, তবে হাতে ত্রিশূল নয় সূচ-সুতো-৯০ ছুঁইছুঁই বয়সেও সৃষ্টির সাধনায় মগ্ন*

শিলিগুড়ি:-

_শহরজুড়ে যখন দেবী দুর্গাকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, তখন শিলিগুড়ির এক ঘরের কোণে নীরবে নিজের মতো করে সৃষ্টি করে চলেছেন এক প্রবীণ শিল্পী।বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই,শরীরের স্বাভাবিক ক্লান্তি রয়েছে,চোখেও আসে বয়সের ছাপ।কিন্তু হাতে সূচ-সুতো উঠলেই যেন বয়স পিছিয়ে যায়।তিনি বাসন্তী দেবী।তাঁর নামের সঙ্গেই যেন মিশে রয়েছে ‘বাসন্তী দুর্গা’র স্মৃতি।তবে তাঁর হাতে নেই অস্ত্র,নেই মাটির প্রতিমা-আছে সূচ,সুতো আর কাপড়।আর সেই সামান্য উপকরণ দিয়েই বছরের পর বছর ধরে তিনি তৈরি করে চলেছেন অসাধারণ সব শিল্পকর্ম।বাসন্তীর শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটাও কম বিস্ময়ের নয়।বাংলাদেশের ঢাকা জেলায় জন্ম তাঁর। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর কাকা ও খুড়তুতো দাদাদের সঙ্গে চলে আসেন জলপাইগুড়িতে। সেখানেই বেড়ে ওঠা।প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি,কিন্তু ছোটবেলা থেকেই হাতের কাজ শেখার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ।বেনারসে কর্মরত এক জেঠতুতো দিদির কাছ থেকে শুরু হয় সেলাই ও উলের কাজ শেখা।তখন সেলাইয়ের সরঞ্জামও ছিল না ঠিকমতো।ছাতার শিক কেটে তৈরি করা হতো বোনার কাঁটা,দিদির দেওয়া দর্জির দোকানের ফেলে দেওয়া কাপড়ের টুকরোতেই চলত অনুশীলন।একদিন পাড়ার এক মেয়েকে কাপড়ের উপর গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ছবি ফুটিয়ে তুলতে দেখে বাসন্তীর মনে জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন-সেলাই দিয়েও যে ছবি আঁকা যায়, শিল্প সৃষ্টি করা যায়,সেই পথেই এগিয়ে যেতে শুরু করেন তিনি।মাত্র ১৫বছর বয়সে শিলিগুড়ির সুভাষপল্লির বীরেন্দ্রনাথ কর্মকারের সঙ্গে বিয়ে হয় বাসন্তীর।বড় সংসারের দায়িত্বে একটা সময় সেলাইয়ের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।পরে সন্তানদের জামাকাপড় তৈরি করতে গিয়ে ফের হাতে ওঠে সূচ-সুতো।সংসারের কাজ শেষ করে রাতে সময় বের করে চলত তাঁর শিল্পচর্চা।৩০বছর বয়সে নিজের জমানো টাকা দিয়ে কেনেন সেলাই মেশিন।স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব আরও বাড়ে।সন্তানদের বড় করে বিয়ে দেওয়ার পর ৬০বছর বয়সে হাতের কাজকেই নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান সঙ্গী করে নেন বাসন্তী।বর্তমানে একটি কাঁথা স্টিচের শাড়ি তৈরি করতে তাঁর প্রায় এক বছর সময় লাগে।একটি ব্লাউজের পিস সম্পূর্ণ করতেও সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস।তাঁর তৈরি কাজ শিলিগুড়ির গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছেছে ভিন রাজ্যেও।বাসন্তী দেবীর কথায়,“এই কাজ করতে গেলে চোখ আর হাত দুটোই ভালো রাখতে হয়।এখন বয়স অনেক হয়েছে,তাই আগের মতো সহজে কাজ করতে পারি না।চোখে যাতে বেশি চাপ না পড়ে,তাই আমি ঘনঘন চোখে জল দিই।তেলাকুচার পাতা,ব্রাহ্মী শাক,কুলেখাড়ার পাতাও খাই।এগুলো খাওয়ার অভ্যাস অনেকদিনের।কাজ করতে গিয়ে চোখে ক্লান্তি আসে,হাতেও কখনও সমস্যা হয়, কিন্তু সূচ-সুতো হাতে নিলে সব ভুলে যাই।কোনও ছবি বা নকশা ভালো লাগলে সেটাকে নিজের মতো করে কাপড়ে ফুটিয়ে তুলি।কয়েক মাস আগে একটি নায়িকার শাড়ির পাড়ের নকশা ভালো লেগেছিল,সেটিও এখন নিজের মতো করে তৈরি করছি।আমার কাজ মানুষ পছন্দ করেন, আমার তৈরি জিনিস বিক্রি হয়-এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।”শুধু কাঁথা স্টিচ নয়,পুতুল তৈরি, উলের কাজ এবং রান্নাতেও দক্ষ তিনি।বয়সের ভার তাঁকে থামাতে পারেনি, বরং নিজের সৃষ্টির মধ্যেই এখনও খুঁজে পান আনন্দ।মেয়ে চন্দনা পুরকায়স্থ বলেন,“মায়ের কাজ দেখে আমরা ছোট থেকেই বড় হয়েছি।বয়স বাড়লেও মা কাজটা ছাড়তে চান না।আমরা চেয়েছিলাম মায়ের এই প্রতিভা আরও মানুষের সামনে আসুক।সেই কারণেই দীনবন্ধু মঞ্চের রামকিঙ্কর হলে দু’দিনের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম।সেখানে অনেক মানুষ এসেছিলেন,মায়ের কাজের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর তৈরি জিনিস নিয়ে গিয়েছেন।ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে মায়ের কাজ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।এই ধরনের শিল্পীরা যেন হারিয়ে না যান,সেজন্য সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে ভালো হয়। মায়ের তৈরি জিনিস আরও দূরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।”দুর্গাপুজোর আগে তাই বাসন্তী দেবীর গল্পটা যেন একটু অন্যরকম।প্রতিমার কারিগর নন তিনি,কিন্তু নিজের হাতের সৃষ্টিকে আজও আগলে রেখেছেন।‘বাসন্তী’ নামের সঙ্গে দুর্গার যোগ থাকলেও তাঁর শক্তির প্রকাশ অন্যভাবে-একটি সূচের ফোঁড়ে,এক টুকরো সুতোয়, কাপড়ের উপর ফুটে ওঠা এক একটি নকশায়।প্রায় ৯০বছর বয়সেও যে হাত সৃষ্টির কাজ থামায়নি,সেই বাসন্তী দেবীই শিলিগুড়ির পুজোর আবহে হয়ে উঠেছেন এক অন্যরকম ‘দুর্গা’র প্রতিচ্ছবি।_