চোখে আলো নেই, তবু মাটির হাঁড়ি-পাতিলেই জীবনের লড়াই জন্মান্ধ ৭০বছরের দীনবন্ধুর হাতের মাটির কাজে অবাক গঙ্গারামপুর, লাঠিতে ভর করেই হাটে-বাজারে বিক্রি করেন নিজের তৈরি সামগ্রী
শীতল চক্রবর্তী বালুরঘাট ৬ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ দিনাজপুর:-চোখে আলো নেই।ছোটবেলা থেকেই পৃথিবীর রং-রূপ দেখার সুযোগ হয়নি।কিন্তু দৃষ্টিহীনতাকে জীবনের কাছে হার মানতে দেননি ৭০বছরের দীনবন্ধু পাল। চোখে দেখতে না পেলেও নিজের হাতের নিপুণতায় মাটি দিয়ে তৈরি করছেন হাঁড়ি, পাতিল-সহ নানা সামগ্রী।সেই তৈরি জিনিসপত্র আবার লাঠিতে ভর করে হাটে-বাজারে ঘুরে নিজেই বিক্রি করছেন বছরের পর বছর ধরে।তাঁর এই আত্মনির্ভরতার লড়াই এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার নাম।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর পুরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের মিশন মোড় সংলগ্ন পালপাড়ার বাসিন্দা দীনবন্ধু পাল। ছোটবেলা থেকেই দুই চোখে দেখতে পান না তিনি।বাবা-মাও বহু বছর আগে মারা গিয়েছেন। জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেই সংসার চালানোর তাগিদে মাটির কাজকে আপন করে নেন দীনবন্ধু। আর বয়স ৭০পেরিয়েও সেই কাজ থামেনি।
পরিবারের সদস্যদের কথায়,ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের কাছ থেকে মাটির কাজ শেখেন দীনবন্ধু।পরবর্তীতে স্ত্রী সন্ধ্যারানী পালের সহযোগিতায় মাটি ছেনা থেকে শুরু করে হাঁড়ি-পাতিল তৈরি—প্রতিটি কাজই নিজের মতো করে রপ্ত করে নেন তিনি।চোখে দেখতে না পেলেও শুধুমাত্র স্পর্শ ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই মাটিকে নিজের হাতের ছোঁয়ায়।মাটির হাড়ি পাতিল গুলো
নিয়ে গঙ্গারামপুর শহরের শিববাড়ি, মিশন মোড়, নিউমার্কেট-সহ বিভিন্ন হাট ও বাজারে যান তিনি। হাতে থাকে একটি লাঠি। সেই লাঠিতে ভর করেই রাস্তা পারাপার থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছনো সবটাই করেন নিজে। এরপর ক্রেতাদের কাছে নিজের তৈরি হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করেন।চোখে দেখতে না পাওয়া মানুষটি কীভাবে এত নিখুঁতভাবে মাটির জিনিস তৈরি করেন,তা দেখে অনেকেই অবাক হয়ে যান।
দীনবন্ধুর সংসার চলে সরকারি ভাতা,রেশনের চাল এবং মাটির সামগ্রী বিক্রি করে পাওয়া সামান্য আয়ে। অভাব রয়েছে, রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। তবু কারও কাছে হাত পেতে না থেকে নিজের শ্রমের উপর ভরসা করেই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দীনবন্ধুর স্ত্রী সন্ধ্যারানী পাল বলেন, “উনি নিজের মতো করে কাজ করে যান।আমাদের দুই মেয়ে স্বপ্না পাল ও ঝর্ণা পালের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।এখন উনি নিজেই মাটির জিনিস তৈরি করেন এবং হাটে-বাজারে ঘুরে তা বিক্রি করেন। স্বামীর ভাতার টাকা আর মাটির জিনিস বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনওরকমে সংসার চলে। সরকার মাথা গোঁজার জায়গা করে দিয়েছে ঠিকই। যদি ভাতার টাকাটা একটু বাড়ানো যেত, তাহলে খুব ভালো হতো।”
নিজের জীবনযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে দীনবন্ধু পাল জানান, “চোখে দেখতে পাই না। তবে কাজ করতে পারি।কেউ ১০ বা ২০ টাকার নোট হাতে দিলে টাকা চিনতে না পারলেও অনেক সময় বুঝে নিতে পারি। লাঠির সাহায্যে চলাফেরা করি। বহু বছর ধরে এভাবেই কাজ করে আসছি।”
প্রতিবেশী সমীর মুখার্জি ও স্থানীয় দোকানদার সিরাজুল মিঞারা জানান,“দীনবন্ধু সব কাজই নিজের মতো করে করতে পারেন।চোখে দেখতে না পেলেও কোনও বিষয়ে সন্দেহ হলে দূর থেকে আমাদের জিজ্ঞাসা করেন। আমরা যতটা পারি সহযোগিতা করি।ওঁকে দেখে অনেক সময় অবাক হয়ে যাই—চোখে না দেখেও কীভাবে এত সুন্দরভাবে মাটির জিনিস তৈরি করেন!”
দীনবন্ধুর জীবনের গল্প শুধুমাত্র একজন দৃষ্টিহীন মানুষের মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরির গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য উদাহরণ।চোখে আলো নেই, কিন্তু নিজের জীবনের পথ খুঁজে নিতে তাঁর ইচ্ছাশক্তির কোনও ঘাটতি নেই।৭০বছর বয়সেও লাঠিতে ভর করে মাটি হাতে নিয়ে কাজ করে চলা দীনবন্ধু যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন—দৃষ্টিহীনতা শরীরের সীমাবদ্ধতা হতে পারে,কিন্তু স্বপ্ন ও আত্মনির্ভরতার পথে তা সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
Home উত্তর বাংলা দক্ষিণ দিনাজপুর চোখে আলো নেই, তবু মাটির ছোঁয়ায় স্বপ্ন গড়েন ৭০-এর দীনবন্ধু! লাঠিতে ভর...





















