স্ত্রীকে খুন করে কাটা মুন্ডু নিয়ে দুই ছেলেকে পাশে বসিয়ে দুর্গামন্দিরে ধ্যান রিন্টুর কাণ্ডে শিউরে উঠছে গঙ্গারামপুর

0
40

স্ত্রীকে খুন করে কাটা মুন্ডু নিয়ে দুই ছেলেকে পাশে বসিয়ে দুর্গামন্দিরে ধ্যান রিন্টুর কাণ্ডে শিউরে উঠছে গঙ্গারামপুর, মৃত্যুর আগে বাঁচার জন্য করুন আবেদন রিন্টুর স্ত্রীর পরিবারের লোকজনদের কাছে গ্রেপ্তার স্বামী ও শাশুড়ি
শীতল চক্রবর্তী গঙ্গারামপুর ৫ নভেম্বর দক্ষিণ দিনাজপুর।
“দাদা, তোর জামাই আমাকে খুন করে মাথা ও রক্ত দিয়ে দুর্গামন্দিরের আসনে বসিয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে ধ্যান করবে বলছে। তাহলেই নাকি ওর সব সমস্যা সমাধান হবে।আমার বুক-পিঠ মিলিয়ে মোট ১৫টি জায়গায় ছুরি দিয়ে আঘাত করেছে, রক্ত ঝর ঝর করে পড়ছে শরীর থেকে। দাদা,আমাকে বাঁচা!” মঙ্গলবার ভোরে পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোনে এটাই ছিল স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হওয়া সীমা ঘোষ সরকারের(৩৫)শেষ আর্তি।সেই ফোনের পর থেকেই শুরু হয় পরিবারের সদস্যদের ছুটোছুটি।কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। স্ত্রীকে খুন করে তাঁর কাটা মুন্ডু হাতে নিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ানো এবং পরে দুর্গামন্দিরে বসে থাকার অভিযোগ উঠেছে স্বামী রিন্টু সরকারের বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নারায়ণপুর ঘোষপাড়া এলাকায়।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে,বোনের ফোন পাওয়ার পর এক মুহূর্ত দেরি করেননি সীমার দাদা রাজেশ। ভোরেই হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে তিনি নারায়ণপুরে রিন্টুর বাড়িতে পৌঁছন।বোনের খোঁজ করতেই রিন্টু জানায়,স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে এবং সীমা কিছুটা আহত হয়েছে।মাকে দিয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলেও জানায় সে। এরপর অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে গঙ্গারামপুর মহকুমা হাসপাতাল-সহ শহরের বিভিন্ন নার্সিংহোমে বোনের খোঁজ শুরু করেন রাজেশ। কিন্তু কোথাও সীমার সন্ধান মেলেনি।শেষ পর্যন্ত তিনি গঙ্গারামপুর থানায় গিয়ে সমস্ত ঘটনা জানান।
খবর পেয়েই তৎপর হন থানার আইসি পুনেন্দু কুমার কুণ্ডু।পুলিশ বাহিনী নিয়ে রিন্টুর বাড়িতে পৌঁছতেই সামনে আসে ভয়াবহ দৃশ্য।অভিযোগ, স্ত্রীর কাটা মুন্ডু হাতে নিয়ে এলাকায় ঘুরছিল রিন্টু। পরে দুই ছেলেকে দুদিকে বসিয়ে কাটা মুন্ডু নিয়ে দুর্গামন্দিরের ভিতরে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। পুলিশ গিয়ে তার হাত থেকে কাটা মুন্ডু উদ্ধার করে।বাড়ির দোতলায় স্ত্রীর দেহ উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি খুনে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রটিও উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ২৮ বছর আগে রিন্টুর বাড়িতে তার বাবার উদ্যোগে দুর্গামন্দির তৈরি হয়েছিল। সেখানে ধুমধাম সহকারে প্রতি বছর দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকে রিন্টুর বাবা বলে খবর।একসময় উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থার গাড়িতে অস্থায়ী কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করত রিন্টু।বাবার বয়সের কারণে পরবর্তীকালে সে নিজেই দুর্গাপুজোর আয়োজন করত।দু’বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর ২০২৫ সালে বাড়িতে পুজো হয়নি।পরে বেসরকারি কাজ হারিয়ে কখনও রিন্টু হাটে-বাজারে,কখনও ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে সংসার চালাত সে।
প্রতিবেশীদের দাবি,বাবার মৃত্যুর পর অশৌচ পর্ব শেষ হলে চলতি বছর ফের দুর্গাপুজোর আয়োজন করার কথা ছিল রিন্টুর। তবে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, পুজো আয়োজন এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আসা-যাওয়া নিয়ে সীমার সঙ্গে শাশুড়ির সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল বলে সূত্রের খবর।বাড়িতে দুর্গাপুজো করার বিষয়টি সীমা ভালোভাবে নিতেন না বলেও জানা গিয়েছে।এই বিষয়কে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি চলছিল বলে প্রাথমিকভাবে খবর।
এদিকে, এই খুনের ঘটনায় রিন্টুর দুই ছেলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রের দাবি,জেরায় দুই ছেলে জানিয়েছে, মাকে গলা কেটে খুন না করার জন্য তারা বাবাকে নিষেধ করেছিল।এই বক্তব্য ঘিরে তদন্তকারীদের মনে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। ঘটনার আগে কী হয়েছিল, দুই ছেলে ঠিক কী দেখেছিল এবং পরিবারের অন্য কেউ ঘটনার বিষয়ে কিছু জানত কি না,তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
বৃহস্পতিবার খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত রিন্টু সরকার এবং তার মাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পর তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে রিন্টুর মাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।অভিযুক্ত রিন্টুকে সাত দিনের পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আদালতে যাওয়ার পথে রিন্টু দাবি করে,“আমার মাথা ঠিক নেই।আমি ভুল করেছি।” অন্যদিকে,সীমার দাদা রাজেশের অভিযোগ,” খুনের আগে বোনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করা হয়েছিল। পরে গলা কেটে খুন করে তাঁদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে রিন্টু।দোষীর ফাঁসির সাজা দাবি করেছেন তিনি।”
জেলা পুলিশ সুপার অভিষেক গুপ্তা জানান, খুনের ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্বামীকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। খুনে ব্যবহৃত সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।”
তবে তদন্তের পাশাপাশি একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে। স্ত্রীকে খুনের পর কাটা মুন্ডু নিয়ে দুর্গামন্দিরে প্রবেশ করার পিছনে কী কারণ ছিল? দুই ছেলের বক্তব্যে কী নতুন তথ্য উঠে আসবে? এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পিছনে পারিবারিক অশান্তিই কি একমাত্র কারণ, নাকি রয়েছে অন্য কোনও রহস্য?আপাতত সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গঙ্গারামপুর থানার পুলিশও।