কোটি কোটি টাকা জলে! মমতার তৈরি আত্রেয়ীর বিতর্কিত বাঁধ ভাঙার সিদ্ধান্ত সুকান্তর

0
70

কোটি কোটি টাকা জলে! মমতার তৈরি আত্রেয়ীর বিতর্কিত বাঁধ ভাঙার সিদ্ধান্ত সুকান্তর, প্রশ্নের মুখে সরকারি অর্থের অপচয় ও প্রশাসনিক গাফিলতি

বালুরঘাট: পিন্টু কুন্ডু — কৃষকদের স্বার্থে কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছিল বাঁধ। লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের রাবার ড্যামের প্রভাবে আত্রেয়ীর জলপ্রবাহে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তার মোকাবিলা করা। অথচ নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই সেই বাঁধ সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে আত্রেয়ী নদীর উপর গড়ে ওঠা স্বল্প উচ্চতার বিতর্কিত বাঁধের ভবিষ্যৎ ঘিরে এবার বড়সড় সিদ্ধান্তের কথা জানালেন বালুরঘাটের বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। পুরনো বাঁধ সরিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন করে কোনও পরিকাঠামো নির্মাণের আগে নদী ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। আর সুকান্তর এই ঘোষণার পরেই সামনে এসেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পের এমন পরিণতি কেন? পরিকল্পনার ত্রুটি, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গাফিলতি, নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা—সরকারি অর্থের এই বিপুল অপচয়ের দায় নেবে কে?

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আত্রেয়ী নদীর উপর রাবার ড্যাম নির্মাণের পর থেকেই এপারের জলপ্রবাহ এবং কৃষিকাজ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ভারতীয় কৃষকদের সমস্যার সমাধানে তৎকালীন রাজ্য সরকার একটি পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ করে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আত্রেয়ীর উপর স্বল্প উচ্চতার বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয় সেই প্রকল্প। কিন্তু স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা পূরণের বদলে নির্মাণের পর থেকেই বাঁধটির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। অভিযোগ, নদীর প্রবল জলস্রোতে বারবার ভেঙে যায় বাঁধের বিস্তীর্ণ অংশ। নদীর স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন, কোথাও ভাঙন, কোথাও জলস্তর নেমে যাওয়ার মতো সমস্যাও সামনে আসে।

বুধবার সংবাদমাধ্যমের সামনে সুকান্ত মজুমদার জানান, আপাতত পুরনো বাঁধটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তড়িঘড়ি নতুন কোনও বাঁধ নির্মাণ করা হবে না। নদীর জলপ্রবাহ, গতিপ্রকৃতি, ভূগর্ভস্থ জলস্তর, নদীভাঙন এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের উপর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখবেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। সুকান্তর দাবি, অবৈজ্ঞানিকভাবে বাঁধ নির্মাণের ফলেই বারবার ভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অতীতে এই বাঁধের জেরে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, নদীর নিজস্ব গতিপ্রকৃতি রয়েছে। সেই বৈশিষ্ট্য না বুঝে নির্দিষ্ট জায়গায় পরিকাঠামো তৈরি করলে নদীর স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে।

কিন্তু এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সমস্যা মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রকল্পই যদি শেষ পর্যন্ত সরিয়ে ফেলতে হয়, তাহলে পরিকল্পনার পর্যায়ে কী ধরনের সমীক্ষা হয়েছিল? নদীর জলবিজ্ঞান, স্রোতের গতি এবং ভাঙনপ্রবণতা যাচাই না করেই কি কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল? নির্মাণের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে কাজের গুণমান পরীক্ষা—প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ও প্রশাসনিক কর্তাদের ভূমিকা কী ছিল? প্রকল্পের ব্যর্থতার পিছনে কোনও গাফিলতি বা অনিয়ম থাকলে তার তদন্ত হবে কি?

আত্রেয়ীর জলপ্রবাহের সমস্যা মেটানোর নামে যে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই পরিকাঠামোই সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের নামে এমন পরিকল্পনাহীন প্রকল্পের খেসারত আর কতদিন দেবেন সাধারণ মানুষ ও সরকারি কোষাগার? নতুন করে বিজ্ঞানসম্মত সমাধান খোঁজার পাশাপাশি পুরনো প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করাও জরুরি। আত্রেয়ীর বুক থেকে বাঁধ সরবে, ফিরবে কি নদীর স্বাভাবিক ছন্দ? আর কোটি কোটি টাকার অপচয়ের হিসাব মিলবে কবে?