0
42

প্রশাসন ঘুমোয়, সমাজ জাগে! মানবিকতায় জেগে উঠল ভাটপাড়া, অন্ধ ঠাকুমা–নাতির আজীবন দায়িত্ব নিলেন নন্দন বোস

বালুরঘাট, ১২ ফেব্রুয়ারী —- ভাঙা চালের ফাঁক গলে আলো ঢোকে, আবার সেই ফাঁক দিয়েই নামে বৃষ্টি। মাটির মেঝেতে ছেঁড়া কাঁথা—সেখানেই দিন গোনেন জন্মান্ধ মুনি হাসদা। পাশে ১৪ বছরের নাতি বিজয় মার্ডি। যে বয়সে স্কুলের ঘণ্টা শোনার কথা, সে বয়সে তার হাত ধরে গ্রাম থেকে গ্রামে ভিক্ষে করতে হয় ঠাকুমাকে। বালুরঘাটের ভাটপাড়ার নয়াপাড়ায় এই নির্মম বাস্তব সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে সমাজের বিবেক—যদিও প্রশাসনের নীরবতা এখনও অটুট।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নন্দন বোস স্ত্রী ঋতুপর্ণা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পৌঁছে যান মুনি দেবীর বাড়িতে। তিন মাসের খাদ্যসামগ্রী—চাল, ডাল, তেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় রসদ—তুলে দেন তাঁদের হাতে। ঘোষণা করেন, “খাবারের অভাবে আর কষ্ট নয়। যতদিন বাঁচব, এই পরিবারের খাদ্যের দায়িত্ব আমাদের।” কথার সঙ্গে প্রতিশ্রুতির দৃঢ়তা ছিল স্পষ্ট।
তবে শুধু আহার নয়, স্বপ্নকেও বাঁচিয়ে রাখতে চান নন্দনবাবু। বিজয়কে অবিলম্বে স্কুলে ভর্তি করানোর আবেদন জানিয়েছেন প্রশাসনের কাছে। “ছেলেটা পড়তে চায়। সুযোগ পেলে এগোবে। পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমরা নেব,” বলেন তিনি। একরাশ লাজুক হাসি নিয়ে বিজয়ের স্বীকারোক্তি—সে বই নিয়ে স্কুলে যেতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে পড়তে চায়। কিন্তু এতদিন সংসারের দায়ই ছিল তার পাঠশালা। নাতির মুখে হাসির শব্দ শুনে মুচকি হাসে মুনি হাসদাও।

মুনি হাসদার আয় বলতে মাসে এক হাজার টাকার প্রতিবন্ধী ভাতা। অগ্নিমূল্যের বাজারে তা নিঃশেষ হতে সময় লাগে না। ফলে ভিক্ষাই ছিল শেষ ভরসা। ভিক্ষে না মিললে উপোস। অসুস্থ শরীর নিয়েও থামার অবকাশ নেই। অথচ সরকারি নানা প্রকল্পের সুবিধা তাঁদের কপালে জোটেনি। ভোটের মিছিল পেরিয়ে যায়, প্রতিশ্রুতির শব্দ মিলিয়ে যায়—ভাঙা দরজায় কড়া নাড়ে না কেউ।
যে খবর প্রকাশ্যে আসতেই বুধবার থেকে এলাকার মানুষ এগিয়ে আসেন। খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেন অনেকেই। তবে নন্দন বোসের আজীবন দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা যেন আশার প্রদীপে ঘি ঢেলে দিল। ঋতুপর্ণা বোসের কথায়, “এমন অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য। সমাজ একসঙ্গে এগোলে তবেই পরিবর্তন সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দা বিপ্লব দেবনাথ বলেন, এ উদ্যোগ অনুকরণীয়। প্রশাসনেরও দ্রুত পদক্ষেপ করা উচিত।

ভাটপাড়ার সেই ভাঙা ঘরে এখন নতুন প্রত্যাশা। যদি প্রশাসন এগিয়ে আসে, তবে হয়তো ভিক্ষার ঝুলি নামিয়ে একদিন বইয়ের ব্যাগ কাঁধে তুলে নেবে বিজয়। অন্ধকার ঘরেও তখন আলো জ্বলবে—মানবিকতার আলো, শিক্ষার আলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here