বালুরঘাট, ২৮ জানুয়ারী —- জমি ফেরতের দাবিতে আদিবাসী কৃষকদের টানা আন্দোলনে কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেল ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার অধীনস্থ কেন্দ্রীয় সাইলো প্রকল্প। মঙ্গলবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ম্যারাথন বৈঠক চললেও কোনও সমাধানসূত্র মিলল না। বরং ক্ষতিপূরণ হিসেবে সাইলো কর্তৃপক্ষের কাছে ১০ কোটি টাকার দাবি তুলে আন্দোলনের চাপ আরও বাড়ালেন জমিদাতারা। শেষমেশ প্রশাসনিক অনুরোধে মানবিক কারণে ৪৮ ঘণ্টার জন্য সাইলোর তালা খুলে আটকে থাকা প্রায় ৫০টি লরি ও দীর্ঘ ১৭ দিন ধরে থমকে থাকা মালবাহী ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সাইলো সম্পূর্ণ বন্ধই থাকছে—এই বার্তায় স্পষ্ট আন্দোলনকারীদের কঠোর অবস্থান।
বুধবার ভোর থেকেই প্রশাসনের তৎপরতায় একে একে লরিগুলি সাইলো চত্বর ছাড়তে শুরু করে। পাশাপাশি শুরু হয় মালবাহী ট্রেন খালাসের প্রক্রিয়া। জমিদাতাদের পক্ষে মদন এক্কা বলেন, “প্রশাসনের অনুরোধেই সাময়িকভাবে লরি ও ট্রেন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের জমি ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।” প্রশাসনের তরফে বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রস্তাব হিসেবে টোটো কেনার কথা বলা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনকারীরা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালে। বালুরঘাটের বোয়ালদাড় মৌজার কাটনা এলাকায় প্রায় ৪৮ বিঘা উর্বর আবাদি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সাইলো নির্মাণের জন্য। লিখিত চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি ছিল—প্রতিটি জমিদাতা পরিবার থেকে একজন করে সদস্যকে চাকরি দেওয়া হবে। সেই আশ্বাসে ভরসা রেখেই প্রায় ৪০টি আদিবাসী কৃষক পরিবার নিজেদের জীবনের একমাত্র সম্বল জমি তুলে দেন। কিন্তু চার বছর কেটে গেলেও চাকরির প্রতিশ্রুতি অধরাই রয়ে যায়। ক্ষোভ জমতে জমতেই শেষ পর্যন্ত সাইলোর গেটে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলনে নামেন জমিদাতারা। যে আন্দোলনের জেরে বিপাকে পড়েন বহু লরি চালক ও মালিক। দীর্ঘদিন ধরে সাইলোর ভেতরে গাড়ি আটকে থাকায় রুজিরোজগার বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের। ক্ষোভে ফেটে পড়ে তারাও সাইলো কর্তৃপক্ষকে ঘেরাও করেন। পরিস্থিতি জটিল হতেই জেলা প্রশাসন মধ্যস্থতায় নামে। মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, এফসিআইয়ের ডিভিশনাল ম্যানেজার ও সাইলো কর্তৃপক্ষ একাধিক দফায় বৈঠকে বসেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। কিন্তু জমি ফেরতের প্রশ্নে কোনও পক্ষই ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি।
আদিবাসী জমিরক্ষা সমিতির নেতা নরেশ হেমব্রম জানান, ২৯ জানুয়ারি থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য সাইলো তালাবন্দি করা হবে এবং প্রশাসনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা চলবে।
অন্যদিকে সাইলো ম্যানেজার বিশ্বজিৎ সূত্রধর জানিয়েছেন, আপাতত আটকে থাকা যানবাহন মুক্ত করা হয়েছে, তবে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন আদিবাসী জমিদাতাদের দাবির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে—বালুরঘাটে সেই বাস্তবতা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই আন্দোলন।

























