হাড়হিম করা কুসংস্কারের বলি! গুনিনের ফতোয়ায় ‘ডাইনি’ অপবাদে পিটিয়ে খুন ষাটোর্ধ আদিবাসী বৃদ্ধা

0
57

বালুরঘাট, ৫ জানুয়ারী —– কুসংস্কার আর জনরোষের নির্মমতায় ফের কলঙ্কিত দক্ষিণ দিনাজপুর। গুনিনের নির্দেশে ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে খুন করা হল ষাটোর্ধ এক আদিবাসী বৃদ্ধাকে। রবিবার রাতের এই ভয়াবহ ঘটনাকে ঘিরে থমথমে কুমারগঞ্জ ব্লকের ডাঙ্গারহাট এলাকার মামুদপুর গ্রাম। ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করলেও আতঙ্কে ঘরছাড়া মৃতার পরিবার।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃত বৃদ্ধার নাম লক্ষ্মী সরেন (৬৯)। অভিযোগ, রবিবার সন্ধ্যায় তাঁর নাতি সঞ্জয় টুডু ধারালো হাসুয়া নিয়ে লক্ষ্মীর উপর হামলা চালায়। বাধা দিতে গেলে মারধর করা হয় বৃদ্ধার ছেলে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের। প্রাণভয়ে তাঁরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। সেই সুযোগে প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে লক্ষ্মী সরেনকে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর জখম অবস্থায় দীর্ঘ সময় মাটিতে পড়ে থাকলেও তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি।
স্থানীয় সূত্রে খবর, মৃত বৃদ্ধার নাতনি সোনমি টুডু দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সেই অসুস্থতার জন্য পরিবার ও গ্রামবাসীদের একাংশ লক্ষ্মী সরেনকেই দায়ী করে। তাঁকে ‘ডাইনি’ বলে অপবাদ দেওয়া হয়। প্রায় ১৫ দিন আগে গ্রামে ডাকা হয় একটি সালিশি সভা। সেখানে প্রতিবেশী রায়খন গ্রামের এক জানগুরু প্রকাশ্যে লক্ষ্মী সরেনকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা’ নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায় দেওয়া হয় তাঁর ছেলে মংলু টুডুর উপর। হতদরিদ্র পরিবারটি প্রায় সাত হাজার টাকা খরচ করে অন্য এক গুনিনের পরামর্শ নিলেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি।
রবিবার রাতের ঘটনার পর খবর পেয়ে কুমারগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রক্তাক্ত বৃদ্ধাকে কুমারগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃতার ছেলে মংলু টুডুর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্ত হিসেবে সঞ্জয় টুডুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে জানগুরু সহ বাকি অভিযুক্তরা এখনো অধরা রয়েছে।
মৃতার পুত্রবধূ লতিকা হাসদা বলেন, “সালিশি সভায় শাশুড়িকে ডাইনি বলা হয়েছিল। তারপরেই গ্রামের লোকজন ইট-পাথর দিয়ে মেরে খুন করেছে। কুসংস্কারের বলি হয়েছেন তিনি। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
কুমারগঞ্জ থানার আইসি রামপ্রসাদ চাকলাদার জানান, “ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মৃতর ছেলে মুংলু টুডু বলেন, সালিশি সভায় তার মাকে ডাইনি অপবাদ দিয়েছিল এক গুনিন। এরপরেই গোটা গ্রাম একত্রিত হয়ে তার বৃদ্ধ মা কে পিটিয়ে খুন করেছে। তাকেও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাড়া করেছে প্রতিবেশী সঞ্জয়। আতঙ্কে স্ত্রী ও শিশুকে নিয়ে ঘরছাড়া হয়ে রয়েছেন। অভিযুক্তদের সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

কুসংস্কারের এই রক্তাক্ত ঘটনা আবারও প্রমাণ করল— আইন থাকলেও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই এখনও অসম্পূর্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here