বালুরঘাট, ১০ ফেব্রুয়ারী —–চোখে আলো নেই, ঘরে অন্ন নেই—তবু হার মানেনি জীবন। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের ভাটপাড়া পঞ্চায়েতের চকশ্যাম সংসদের নয়াপাড়া গ্রামের এক কোণায় প্রতিদিন লেখা হচ্ছে এমন এক বাস্তব কাহিনি, যা পর্দার সব গল্পকে লজ্জায় ফেলে দেবে। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন ৫৫ বছরের মুনি হাসদা ও তাঁর ১৪ বছরের নাতি বিজয় মার্ডির বেঁচে থাকার লড়াই আজ শুধুই একটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের সামনে ছুড়ে দেওয়া এক নির্মম প্রশ্ন।
কাগজে-কলমে মুনি হাসদা একশো শতাংশ প্রতিবন্ধী। অথচ সেই স্বীকৃতির বিনিময়ে মাসে জোটে মাত্র এক হাজার টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা। অগ্নিগর্ভ বাজারে যা কয়েকদিনেই শেষ। মাসের বাকি দিনগুলোতে ভরসা একটাই—ভিক্ষার ঝুলি। মুনির কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, ভিক্ষে না পেলে না খেয়েই দিন কাটে। সংসার বলতে কার্যত কেউ নেই। একমাত্র ছেলে ভবঘুরে। বাবা-মা হারানো ছোট্ট বিজয়ই আজ অন্ধ বৃদ্ধার একমাত্র অবলম্বন। আবার বিজয়ের কাছেও ঠাকুমাই শেষ আশ্রয়। যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে ঠাকুমার হাত ধরে রাস্তায় নামতে হয় তাকে। পড়াশোনার কথা উঠতেই বিজয়ের চোখে জল। ধরা গলায় সে বলে, ভিক্ষে না করলে খেতে পাই না। তাই স্কুলে যাওয়া হয়নি কোনওদিন।
শৈশবের হাসি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলো, স্কুলের বেঞ্চ—সবই আজ বাস্তবের কঠিন লড়াইয়ে হারিয়ে গিয়েছে। ভাঙা কুঁড়েঘর আর ছেঁড়া কাঁথাই তাদের ঠিকানা। তবু অন্ধত্বকে হার মানাননি মুনি হাসদা। নাতির হাত ধরে ভিক্ষে করা ছাড়াও উনুনের সামনে বসে প্রতিদিন নিজের মতো করে রান্না করে নাতিকে খাওয়ান তিনি। চোখে আলো নেই, কিন্তু মনের ভিতর আগুন। মুনি বলেন, একবেলা খাই, একবেলা না খেয়েই থাকি। পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।
এলাকাবাসীদের দাবি, সরকার যদি আরও কিছু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত, তাহলে এই পরিবারটির জীবন অনেকটাই বদলে যেত। প্রতিবেশী হেমন্তি টুডু বলেন, ছোট থেকেই মুনি অন্ধ। আদিবাসী অধ্যুষিত এই পাড়ায় সবাই গরিব। সাহায্য করার ক্ষমতা কারও নেই। তাই বাধ্য হয়ে নাতিকে নিয়ে ভিক্ষে করে।
অন্যদিকে, বালুরঘাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অরূপ সরকার জানিয়েছেন, এ ধরনের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার একাধিক প্রকল্প রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—ভোট আসে, আশ্বাস আসে, প্রকল্পের তালিকাও দীর্ঘ হয়। কিন্তু অন্ধ ঠাকুমা আর তার নাতির জীবনে কবে সত্যিই আলো নামবে? ভিক্ষার ঝুলিতেই কি বন্দি থাকবে একটি শৈশব, নাকি কোনও একদিন সমাজের বিবেক জেগে উঠবে?























