শীতল চক্রবর্তী, বালুরঘাট, ৮ ফেব্রুয়ারি:প্রথা মেনে মাজারে সিরনি চড়িয়ে জিন্দাপির সৈয়দ করম আলি শাহ টাটশাহী ফকিরের উরস উৎসব পালন করলেন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন। একই সঙ্গে পীরের মাজার সংলগ্ন কান্তা ওরফে পদ্মমনি সমাধিতে অনুষ্ঠিত হয় হরিনাম সংকীর্তন। স্বাভাবিকভাবেই এই মিলন উৎসব ঘিরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ছবি ফুটে উঠল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুরের ধলদিঘিতে।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার মাজারগুলির মধ্যে অন্যতম ও ঐতিহাসিক মাজার হিসেবে পরিচিত ধলদিঘির জিন্দাপির সৈয়দ করম আলি শাহ টাটশাহী ফকিরের মাজার। এই মাজারকে ঘিরে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। বহু জানা-অজানা ইতিহাস আজও লোককথার আকারে প্রচ
কথিত আছে, প্রায় ২৫১ বছর আগে ইসলামিক ধর্মপ্রচারক সৈয়দ করম আলি শাহ টাটশাহী ফকিরের আস্তানা ছিল কটকি হারে। পরবর্তীতে তিনি ধলদিঘিতে চলে এসে সেখান থেকেই ধর্মপ্রচার শুরু করেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হিন্দু সমাজেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। জনশ্রুতি অনুযায়ী, জয়পুরে কান্তা বা পদ্মমনি নামে তাঁর এক হিন্দু শিষ্য ছিলেন।লোককথা অনুসারে, জিন্দাপির সারা বছর আস্তানা ত্যাগ করতেন না। তবে প্রতিবছর ২৫শে মাঘ ভোরবেলায় তিনি আস্তানা থেকে বেরিয়ে ধলদিঘিতে স্নান করতেন। স্নান শেষে চটের তৈরি জামা-কাপড় পরে আবার এক বছরের জন্য আস্তানায় প্রবেশ করতেন। চটের পোশাক পরিধানের কারণেই তাঁর নাম হয় ‘টাটশাহী ফকির’। তিনি মারা যাওয়ার পর ধলদিঘির পাড়েই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সেই স্মৃতিকে ঘিরেই প্রতি বছর ২৫শে মাঘ উরস উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
নিয়ম অনুযায়ী, জিন্দাপিরের শিষ্যদের দেহ রাখলেও মাজারের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। ফলে উরস উৎসবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন ডগা পুজোর মাধ্যমে মাজারে পোলাও, মুরকি, বাতাসা সহ নানা সামগ্রী দিয়ে সিরনি দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে কান্তা বা পদ্মমনি সমাধিতে অনুষ্ঠিত হয় হরিনাম সংকীর্তন।
এদিন সকাল থেকেই জেলার হরিরামপুর, কুশমণ্ডি, বংশীহারী, তপন, বালুরঘাট, হিলি, কুমারগঞ্জ ও গঙ্গারামপুর ব্লকের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ ধলদিঘিতে এসে হাজির হন। সকাল থেকেই দিঘির দুই পাড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন উনুন জ্বালিয়ে পোলাও রান্না শুরু করেন। বেলা বাড়তেই পোলাও, মুরকি, ঘোড়া-সহ নানা সামগ্রী দিয়ে মাজারে সিরনি দেওয়ার জন্য ভিড় জমে ওঠে। বহু মানুষ দিঘির পাড়েই রান্না করে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সারেন।
এক সময় উরস উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে বিশাল মেলা বসত। পশু কেনাবেচা, নানা রকম সামগ্রীর দোকানের পাশাপাশি সিনেমা হল, বড় যাত্রাপালা ও সার্কাস ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ। প্রায় দু’মাস ধরে চলত এই মেলা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জৌলুস কমেছে। এখন আর সিনেমা হল বা বড় সার্কাস আসে না। তবে স্থানীয়দের উদ্যোগে বর্তমানে সাতদিনের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় স্টেশনারি দোকান থেকে শুরু করে নানা রকমারি দোকান, নাগরদোলা ও ব্রেক ড্যান্স নতুন প্রজন্মের আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
উৎসবে অংশ নিতে আসা নীলিমা বিবি নামে এক গৃহবধূ বলেন, “আমার মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ায় পীর সাহেবের মাজারে সিরনি দিয়েছি।”
প্রবীণ রাজ্জাক সরকার জানান, “প্রায় ৫০বছর ধরে পীর সাহেবের কাছে সিরনি দিতে আসছি। এবছরও পরিবার নিয়ে এসেছি। সিরনি দেওয়ার পাশাপাশি দিঘির পাড়ে রান্না করে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করলাম।”
গৃহবধূ মিঠু দেবশর্মা বলেন, “মাজারে সিরনি দেওয়ার পাশাপাশি হরিনাম সংকীর্তনে বাতাসা লুট দিয়েছি।”
স্থানীয় তথা মেলা মেলা পরিচলন কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা এই উৎসবের স্মৃতিচারণা করে বলেন, “ছোটবেলায় ধলদিঘির মেলা আমাদের কাছে আলাদা আবেগ ছিল। সন্ধ্যায় বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে আসতাম। আজ সেই মেলার রূপ বদলেছে, কিন্তু হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির যে বন্ধন, তা আজও অটুট।”
ধলদিঘির উরস উৎসব তাই আজও ধর্ম, সংস্কৃতি।
Home উত্তর বাংলা দক্ষিণ দিনাজপুর উরস ও হরিনাম সংকীর্তনে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত—ধলদিঘিতে জিন্দাপির টাটশাহী ফকিরের ঐতিহ্যবাহী উৎসব
























